ঢাকা , শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫ , ২২ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
সংবাদ শিরোনাম
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বড় আঘাত গণতান্ত্রিক স্থিতিশীল শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন মোদির দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করতে বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড এমওইউ মোদীকে দশ বছর আগের কথা মনে করিয়ে ছবি উপহার ইউনূসের নতুন সমীকরণে বাংলাদেশ-ভারত বাস চালকের হদিস মেলেনি আহত শিশু আরাধ্যকে ঢাকায় হস্তান্তর নিহত বেড়ে ১১ স্বস্তির ঈদযাত্রায় সড়কে ঝরলো ৬০ প্রাণ চালের চেয়েও ছোট পেসমেকার বানালেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা আ’লীগের নেতাদের রাজকীয় ঈদ উদযাপনে ক্ষুব্ধ কর্মীরা আন্দোলনে ফিরবেন বেসরকারি কলেজ শিক্ষকরা মাদারীপুরে আগুনে পুড়ল ২ বাড়ি ভৈরবের ত্রি-সেতুতে দর্শনার্থীদের ভিড় বর্ষবরণের আয়োজন, পাহাড়ে উৎসবের রঙ ঈদের আমেজ কাটেনি বিনোদন স্পটে ভিড় আ’লীগকে নিষিদ্ধ করা বিএনপির দায়িত্ব নয় নতুন নিয়মে বিপাকে ট্রাভেল এজেন্সিগুলো ঈদের আগে বেতন-বোনাস পেয়ে স্বস্তিতে সাড়ে ৩ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক ঈদযাত্রায় সদরঘাটে চিরচেনা ভিড় মিয়ানমারে ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা

ঢাকাবাসী নিঃশ্বাসে টানছে বিষ

  • আপলোড সময় : ০২-১২-২০২৪ ১০:৪৭:০১ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ০৩-১২-২০২৪ ০১:০৪:১২ পূর্বাহ্ন
ঢাকাবাসী নিঃশ্বাসে টানছে বিষ

* রাজধানীর বাতাসে বাড়ছে নীরব ঘাতক সিসা * হাড় ও দাঁতে জমা হয়ে থাকতে পারে ২০ থেকে ৩০ বছর  * ২৫ শতাংশ শিশুর ফুসফুস পূর্ণমাত্রায় কাজ করছে না * সিসা দূষণে বিশ্বের প্রায় ১০ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু  * খাদ্য-পানীয়, শ্বাসপ্রশ্বাস ও চামড়ায় সিসা মানবদেহে প্রবেশ করছে * শরীরে রক্তের সঙ্গে সিসা মিশে যকৃৎ, কিডনি, হাড়সহ  সবকিছু করছে  আক্রান্ত  * সিসা দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ

ঢাকাবাসী প্রতিনিয়িত শ্বাসপ্রশ্বাসের সাথে টানছে ভয়াবহ বিষ। যা আক্রান্ত করছে যকৃৎ, কিডনি, হাড়সহ সবকিছু। আর এই বিষের নাম হচ্ছে সিসা। খাদ্য-পানীয়, শ্বাসপ্রশ্বাস ও চামড়ার মাধ্যমে সিসা প্রবেশ করছে মানবদেহে। এই সিসা দেহের কোমল পেশিতন্ত্রগুলো আক্রান্ত করছে। রক্তে এটি ছয় থেকে সাত সপ্তাহ অবস্থান করে। মানুষের শরীরে সিসা প্রবেশ করলে তা সহজে অবমুক্ত হয় না। সিসা মূলত মানুষের শরীরের হাড় ও দাঁতে জমা হয়। যেখানে এটি ২০ থেকে ৩০ বছর থাকতে পারে। সিসা দূষণের কারণে বিশ্বের প্রায় ১০ লাখ মানুষের অকালমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
জানা গেছে, রাজধানীর বায়ুতে সাধারণত ২১ শতাংশ অক্সিজেন, ৭৮ শতাংশ নাইট্রোজেন, দশমিক ৩১ শতাংশ ভাগ কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং নির্দিষ্ট অনুপাতে ওজন, হাইড্রোজেন ইত্যাদি থাকার কথা। কিন্তু ঢাকার বাতাসে অক্সিজেনের ঘাটতি হয়ে অন্য গ্যাসের ঘনত্ব বেড়ে গেছে এবং সিসা ও বালুকণার হার বেড়ে বাতাস দূষিত হয়ে গেছে। ঢাকার বাসা থেকে বেরোলেই এ বায়ু দূষণ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে হচ্ছে রাজধানীবাসীকে। ধুলায় আচ্ছন্ন ঢাকা শহরটি যেন কুয়াশা মতো ঢেকে থাকে সারাক্ষণ। বায়ু দূষণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। গত বছর রাজধানীর ছয়টি স্কুলের শিশুদের ফুসফুসের কার্যকারিতার ওপর গবেষণা চালান হয়। গবেষকরা বলছেন, ২৫ শতাংশ শিশুর ফুসফুস পূর্ণমাত্রায় কাজ করছে না এবং এদের বেশিরভাগেরই বয়স নয় থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। বায়ুদূষণের ফলেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান গবেষকরা।
সূত্র জানায়, রাজধানীতে বাতাসে ভাসছে বিষাক্ত বিষ। রাজধানীবাসীর প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ নেই। কারণ নিঃশ্বাসের সঙ্গে বিষ ঢুকে যাচ্ছে। বর্তমানে ঢাকার বাতাসে বিষই উড়ে বেড়াচ্ছে। ঢাকা শহরের বাতাসে ভাসছে নীরব ঘাতক সিসা। সিসা দূষণের বিষয়টি অনেকের জানা নেই। এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সিসাকে জনস্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম ক্ষতিকারক রাসায়নিক উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সিসাযুক্ত জ্বালানি (যানবাহন নির্গমন) রং, ও পানি সরবরাহের পাইপ থেকে সিসা দূষণ ঘটতে পারে। ধনে, হলুদ, মরিচ এ ধরনের মসলার মধ্যে সিসার উপাদান পাওয়া গেছে। কম দামের কিছু গয়না, কসমেটিক্স-লিপস্টিক, নেইল পালিশ, চোখের সুরমা ও কাজল) সিঁদুর, সিসা দূষিত মাটিতে চাষ করা সবজি সিসাযুক্ত দেয়াল রং, রঞ্জক পদার্থ, খেলনা, অ্যালুমিনিয়াম ও সিরামিকের বাসনপত্র, আয়ুর্বেদিক ওষুধ ও তাবিজ ইত্যাদিতেও সিসা পাওয়া যাচ্ছে। পুরোনো ব্যাটারির সিসা বের করে পুনরায় ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। দেশে ব্যাটারি পুনঃচক্রায়ন সিসার একটি বড় উৎস।
শিশুর খেলনায় সহনীয় মাত্রা বিষাক্ত উপাদানের নূন্যতম সীমা হচ্ছে-সিসা ৯০ পিপিএম, পারদ বা ৬০ পিপিএম মার্কারি, ৭৫ পিপিএম ক্যাডমিয়াম, ২৫ পিপিএম আর্সেনিক ও ২৫০ পিপিএম পর্যন্ত ব্রোমিয়াম। পিপিএম একক হলো ‘পার্টস পার মিলিয়ন’ অর্থাৎ অতিলঘু দ্রবণের ঘনমাত্রা প্রকাশের প্রচলিত ও কার্যকরী পদ্ধতি। কিন্তু এসব সামগ্রীতে ৩২০ পিপিএম পরিমাণ সিসা, ১৩৯০ পিপিএম ক্রোমিয়াম, ১২৮০ পিপিএম ব্রোমিয়াম ও ২৪৭ পিপিএম আর্সেনিক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে শিশুর খেলনা পুতুল, বর্ণমালা, খেলনা গাড়ি, ব্যাঙ, মগ, ফিডার, প্যাসিফায়ারসহ (শিশুর চুষনি) নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রীতে ক্ষতিকর উপাদানগুলো মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে। রাজধানীর চকবাজার, নিউ মার্কেট, গাউছিয়া মার্কেট, বসুন্ধরা সিটি, অর্কিড প্লাজাসহ বেশ কিছু জায়গা থেকে ১৬০টি খেলনার নমুনা সংগ্রহ শেষে সেগুলো পরীক্ষা করে এ তথ্য জানা গেছে। গবেষণায় শিশুদের ব্যবহৃত সাধারণ পানির কাপে ১৩৮০ পিপিএম সিসা, ২৪৭ পিপিএম আর্সেনিক ও ১৩৯০ পিপিএম ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। শিশুদের ব্যবহৃত স্টেশনারি ব্যাগে ৫৮০ পিপিএম সিসা, ১২৮০ পিপিএম ব্যারিয়াম, ৮৮ পিপিএম পারদ পাওয়া গেছে। এ ক্ষেত্রে স্কুলের ব্যাগই শিশুর জন্য বিপজ্জনক। পুতুল সেটে ১৬০ পিপিএম সিসা ও ১৫০০ পিপিএম ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে।
শিশুদের পানি খাওয়ার মগে ২২০ পিপিএম সিসা, ৩১৫ পিপিএম ক্যাডমিয়াম ও ১৬৮০ পিপিএম ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। একটি সুপরিচিত খেলনা দোকান থেকে কেনা পুতুল সেটে প্রায় ৫০০ পিপিএম সিসা পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে যে, বড় দোকানগুলোও এই ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থমুক্ত নয়। এ ছাড়া, শিশুদের শেখার জন্য তৈরি বর্ণমালা সেটের একটি অক্ষরে ৬৬০ পিপিএম সীসা পাওয়া গেছে।
ইনস্টিটিউট অব হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের (আইএইচএমই) গবেষণার মতে, সিসা দূষণের কারণে বিশ্বের প্রায় ১০ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটেছে। নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোয় তুলনামূলকভাবে মৃত্যু ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি। বিষাক্ত ধাতু সিসা বেশ সহজলভ্য এবং হাজার বছর ধরে বিভিন্নভাবে ব্যবহারের ফলে এটি পরিবেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন উপায়ে মানুষ সিসার সংস্পর্শে আসছে। সিসা একটি বিষাক্ত ভারী পদার্থ। যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। সিসা খুব অল্প তাপে গলে যায় এবং বাষ্পীভূত হয়। ফলে একে বিভিন্ন পদার্থের সঙ্গে মিশিয়ে গুণগত মান উন্নয়নে ব্যবহার করা হয়। খাদ্য-পানীয়, শ্বাসপ্রশ্বাস ও চামড়া এ  তিনটি উপায়ে সিসা মানবদেহে প্রবেশ করে। এটা শরীরে রক্তের সঙ্গে মিশে যকৃৎ, কিডনি, হাড়সহ সবকিছুই আক্রান্ত করে। এটা দেহের কোমল পেশিতন্ত্রগুলো আক্রান্ত করে। রক্তে এটি ছয় থেকে সাত সপ্তাহ অবস্থান করে। মানুষের শরীরে সিসা প্রবেশ করলে তা সহজে অবমুক্ত হয় না। সিসা মূলত আমাদের হাড় ও দাঁতে জমা হয়। যেখানে এটি ২০ থেকে ৩০ বছর থাকতে পারে।
পরিবেশের অন্যান্য দূষণ মানুষ সহজে চিহ্নিত করতে পারে। যেমন পানি দূষণে স্বাদ, গন্ধ ও রঙের পরিবর্তন দেখা যায়। বায়ু দূষণে চোখ ঝাপসা বা নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কিন্তু সিসা দূষণ একেবারে নীরবে ঘটে। এটি খালি চোখে চিহ্নিত করা যায় না। সব ধরনের দূষণে সিসা একটি অনুঘটক। পানি, বায়ু ও মাটি দূষণেও সিসা পাওয়া যায়। এটি নিয়ন্ত্রণে ২০০৬ সালে প্রথম পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের অধীনে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এ সংক্রান্ত আইন আছে। কিন্তু সব বিষয় আইনের আওতাভুক্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্রে সিসাযুক্ত রং ব্যবহারে বিধিনিষেধ দিয়ে আইন আছে। প্রতিটি দূষণের সঙ্গে সিসার সম্পৃক্ততা আছে। তাই সংশ্লিষ্ট সব আইনে এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। সিসা নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এ সংক্রান্ত নীতিমালায় ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনার কথা বলা আছে।
দেশের পরিবেশগত সব সমস্যা নিয়ন্ত্রণের ভার পরিবেশ অধিদফতরের ওপর। এককভাবে তাদের পক্ষে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এছাড়া পরিবেশ অধিদফতরে লোকবল সংকট ও কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয় রয়েছে। এ সমস্যার সমাধানে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় খুবই জরুরি। সিসা দূষণ রোধে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এক হয়ে সরকারের সমাধানের পথ খুঁজে বের করা দরকার। শিশুদের ব্যবহারের লাল ও হলুদ রঙের পেনসিলেও প্রচুর সিসা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৮ সালে আবাসস্থলে সিসা মিশ্রিত রঙের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। অনেক দেশ রঙে সিসার পরিমাণ কমানোর জন্য আইন প্রণয়ন করেছে। কিন্তু ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্যভুক্ত অন্তত ৭৬টি দেশে সিসা মিশ্রিত রঙের উৎপাদন, আমদানি, বিক্রয় এবং ব্যবহারের বিষয়ে কোনো রকম নিয়ন্ত্রণ ও বাধ্যবাধকতা নেই। স্বল্পমূল্যের ব্যাটারিচালিত মোটরযানের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে এলআইসিতে লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির ব্যবহার মাত্রাতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় সব লেড-অ্যাসিড ব্যাটারিই পুরোনো ব্যাটারি পুনরায় চক্রায়ন এবং ফেলে দেয়া ধাতু থেকে তৈরি করা হয়। ব্যাটারিতে ব্যবহৃত সিসার প্রায় পুরোটাই পুরোনো হওয়ার পরও তা পুনরুদ্ধার এবং পুনরায় চক্রায়ন করা সম্ভব। পুরোনো ব্যাটারিগুলো গলিয়ে অশোধিত সিসা পাওয়া যায়, যা নতুন ব্যাটারি তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। উন্নত দেশের গাড়িতে ব্যবহৃত ব্যাটারিসহ ই-বর্জ্যগুলো অনুন্নত দেশগুলোয় রফতানি করে দেয়া হয়, যার বেশিরভাগই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার অপ্রাতিষ্ঠানিক সিসা কারখানায় জায়গা করে নেয়, যা সেই অঞ্চলকে অতিরিক্ত সিসা দূষণের ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
একদিকে অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্রের উচ্চ চাহিদা আর অন্যদিকে পুনরায় চক্রায়ন বাজার থেকে বিপুল পরিমাণে এর সরবরাহের কারণে বর্তমান পৃথিবীতে বিশাল এক অ্যালুমিনিয়াম শিল্প প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। মৃৎশিল্পেও তৈজসপত্র চকচকে করার কাজে সিসার প্রলেপ ব্যবহার করা হয়। লেড ক্রোমেট হচ্ছে বাজারে সচরাচর পাওয়া যায় এমন একটি সস্তা রাসায়নিক হলুদ রং, যা নিয়মিত ঘরোয়া খাবার তৈরিতে ব্যবহারের ফলে তা সিসা দ্বারা দূষিত হচ্ছে। হলুদের ব্যবসায়ীরা যে নিম্নমানের শিকড় বিক্রি করে এবং সিসা মিশ্রিত খারাপ মানের হলুদ গুঁড়া বাজারে এনে নিজেদের লাভের পাল্লা ভারী করে। ডিজেল ও পেট্রলে সিসা যুক্ত থাকে। যদিও ২০২৪ সালে বৈশ্বিকভাবে সিসাযুক্ত পেট্রলের ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে। সিসা দূষণের ক্ষতি থেকে পরবর্তী প্রজন্মকে বাঁচাতে সচেতনতার বিকল্প নেই।
সিসা গলানোর সময় যে ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়, তাতে কিছু পরিমাণ সিসা বাতাসে মিশে যায়। পরে নিশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। আবার গলিত সিসা মাটির সঙ্গে মিশে যায়। পরে এই সিসা বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে জমিতে ছড়িয়ে পড়ে। শস্যদানা ও চাষ করা মাছের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে।
গর্ভাবস্থায় সিসার সংস্পর্শে এলে শিশুর স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং তার দৃষ্টি, শ্রবণ এবং শিখন বিকাশগত সমস্যা থেকে শুরু করে আচরণগত সমস্যা তৈরি করতে পারে। বিভিন্ন সময়ে করা পরিসংখ্যানমতে, যেসব শিশুর রক্তে ২.৪-১০ মাইক্রোগ্রাম বা ডেসিলিটার মাত্রায় সিসার উপস্থিতি থাকে, তাদের বুদ্ধিমত্তা কম, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় তারা কম কৃতকার্য হয় এবং পুরো জীবনকালে কম অর্থ আয় করে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) রক্তে সিসার ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রা ৬০ মাইক্রোগ্রাম বা ডেসিলিটার থেকে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা ডেসিলিটার-এ নামিয়ে এনেছে। যদিও রক্তে সিসার উপস্থিতির ক্ষেত্রে এমন কোনো প্রমাণিত নিরাপদ মাত্রা নেই, বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে এমন কোনো মাত্রা নেই। মূল কথা হলো, সমস্যার বা ঝুঁকির মাত্রা বাড়তে থাকে যত বেশি উচ্চ মাত্রার সিসা ব্যবহার করা হবে এবং সংস্পর্শে আসা হবে।
সিসা দূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। সিসা দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। বর্তমানে বাংলাদেশে আনুমানিক সাড়ে তিন কোটি শিশুর শরীরে উচ্চমাত্রার সিসা রয়েছে। সিসা দূষণের ফলে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি, বুদ্ধিমত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
গবেষণায় দেখা যায়, সিসাজনিত শুধু বুদ্ধিমত্তা ঘাটতির ফলে মানবসম্পদের নিম্নমুখী উৎপাদনশীলতার কারণে দেশে বছরে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এই পরিমাণ বাংলাদেশের গড় অভ্যন্তরীণ সম্পদের (জিডিপি) ৬ শতাংশ। দেশের শিশুরা খর্বাকৃতির হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে সিসা দূষণের সম্পর্ক থাকতে পারে। বিআইসিসিতে ‘আন্তর্জাতিক সিসা দূষণ প্রতিরোধ সপ্তাহ’ উপলক্ষে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং ইউনিসেফ আয়োজিত জাতীয় কর্মশালায় সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার কৌশল প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮০ কোটি শিশুর রক্তে উচ্চমাত্রায় সিসা আছে। এদের বেশিরভাগই নিম্ন আয়ের দেশে বসবাসরত। কারণ, সেখানে সিসার অধিক ব্যবহার এবং দূষণ হয়ে থাকে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোর মতো পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রিত হয় না। বেশিরভাগ শিশুই এশিয়া এবং আফ্রিকার, তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপিয়ান দেশগুলোয়ও এই অনুপাত কম নয়। সিসা দূষণ শিশুদের ছোট বয়সে স্বাস্থ্য এবং বিকাশের ওপর বহুমুখী এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে, যার জন্য সারা জীবন ধরে তাদের ভুগতে হয়। এমনকি প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, সিসার বিষাক্ততা শিশুর মস্তিষ্ক এবং স্নায়ুতে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করে, যা কিনা নিপীড়ন এবং অপরাধ করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়ার মূল কারণ।
অপর একটি সূত্র জানায়, সিসা দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ, যাদের মধ্যে সাড়ে তিন কোটির বেশি শিশুর রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় ক্ষতিকর এ ভারি ধাতুর উপস্থিতি থাকার তথ্য দিয়েছে জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ। সংস্থাটি বলছে, বিশ্বব্যাপী ৮০ কোটি শিশু, ৩ জনের মধ্যে ১ জন সীসার বিষক্রিয়ায় ভোগে, যা তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কেড়ে নেয় এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, সিসা একটি ভারী ধাতব পদার্থ হিসেবে জানি। এটি মানব শরীরের জন্য ক্ষতিকর। ক্ষতিটা সবচেয়ে বেশি হয় শিশু-কিশোর এবং গর্ভবর্তী নারীদের। গর্ভবর্তী নারীদের ক্ষেত্রে তার গর্ভস্থ শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ ব্যবহৃত হতে পারে এবং জন্মগত বিকলাঙ্গ বা অটিস্টিক শিশু জন্ম নিতে পারে। জন্মের পরে শিশু যদি সিসা দূষণের শিকার হয় তার নার্ভের বিকাশ ঠিকমতো হয় না, ব্রেনই বা মস্তিষ্ক তার বিকাশ ব্যবহৃত হয়। ফলে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তি কমে যায়, অতি চঞ্চলতা অথবা মনোযোগহীনতা তার মধ্যে তৈরি হয় এবং অন্যদিকে তার শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-পতঙ্গগুলো যেমন-লিভার, কিডনি, পাকস্থলী এগুলোর জন্য সিসা ক্ষতিকর। সিসা ক্যানসার তৈরির একটি উপাদানও বটে। অন্যদিকে, শোনার ক্ষমতা সেটিও সিসার জন্য কিন্তু কমে যায়। লেলিন চৌধুরী বলেন, সিসার কারণে মেরুদণ্ডের বিকৃতি নিয়ে ও মেরুমজ্জার বিকৃতি নিয়ে শিশু জন্মগ্রহণ করতে পারে। এর বাহিরে ত্বকের সমস্যা এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের মতো সমস্যা সিসার কারণে হতে পারে। সিসার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার প্রধান বিষয় হচ্ছে, কি পরিমাণ সিসা ব্যবহার করা যাবে না এবং কোন মাত্রার বেশি ব্যবহার করলে মানব শরীরের জন্য সিসা ক্ষতিকর থাকবে সেটি একটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নির্ধারিত করে দেয়া হয়। আমাদের সেটি নির্ধারণ করা উচিত। যে পণ্যগুলোতে সিসার ব্যবহার বেশি হয় সেগুলোকে দৈব চয়নের মাধ্যমে পরীক্ষা করা দরকার। যেসব কোম্পানি বা কারখানার প্রস্তুতকৃত দ্রব্যে সিসার পরিমাণ বেশি পাওয়া যাবে সেটিও কিন্তু আমরা আইনের আওতায় আনতে পারি।
বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক কামরুজ্জমান মজুমদার বলেছেন, বাংলাদেশের নগর অঞ্চলগুলোতে অন্যতম প্রধান সমস্যার একটি হলো বায়ু দূষণ। বায়ু দূষণের অন্যতম একটি উপাদান সিসা দূষণ। ভয়ের বিষয় হলো সিসা বায়ু ছাড়াও মাটি এবং পানিকে দূষিত করছে। বাংলাদেশের প্রায় ৬০ ভাগ শিশুর শরীরে তাদের যে অনুমোদিত মাত্রা রয়েছে তার চেয়ে বেশি মাত্রার সীসার উপস্থিতিতি পাওয়া গেছে। শুধু বাংলাদেশে প্রায় তিন কোটির বেশি শিশু সীসা দূষণে আক্রান্ত। দূষণ বা আক্রান্ত যতটুকু আছে এই সংখ্যাটা নিয়ে কথা কম হচ্ছে এবং প্রচার কম হচ্ছে এবং গবেষণাও কম হচ্ছে। আগামী দিনে যারা আমাদের দেশের নেতৃত্ব দেবে তারা যদি সিসা দূষণে আক্রান্ত হয় তাহলে অবস্থাটা কি হবে এখনই ভাবতে হবে।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, আগামী দিনে যারা আমাদের দেশের নেতৃত্বে যাবে তারা যদি সীসা দূষণে আক্রান্ত  শিশু হয়ে থাকে, যাদের মতিস্ক বিকাশ ও বৃদ্ধি কম হয় তাহলে আগামী দিনের আইকিউ কম থাকা বা মস্তিষ্ক কম বিকাশ হওয়া শিশুদেরকে নিয়ে আমরা কি করতে পারব? সেজন্য সিসার উৎস চিহ্নিত করে একটা একটা ধরে ধ্বংস করতে হবে। ব্যাটারি থেকে সবচেয়ে বেশি সিসা নির্গত হচ্ছে। আমাদের যানবাহনের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ব্যাটারিচালিত যানবাহনের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। মোবাইল ফোনের অব্যবহৃত ব্যাটারি থেকেও সিসা দূষণ হয়। পুরাতন সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির অপরিকল্পিত রিসাইক্লিং বন্ধ করে সিসা দূষণের হাত থেকে শিশুদেরকে রক্ষা করতে হবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

কমেন্ট বক্স